আমি ৮ ফাল্গুনের কথা বলছি

আমি ৮ ফাল্গুনের কথা বলছি
৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২১ফেব্রয়ারি ১৯৫২, বাংলা নয় উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা---মূলত এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে যারা সেদিন বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, রাজপথ রঞ্জিত করেছিল, তাদেরকেই আমরা স্মরণ করি বছরের এই দিনটিতে। ৮ ফাল্গুনের এই দিনে মাতৃভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছিল তাদের সুবাদে একটি জাতি হয়েছিল ধন্য।

পৃথিবীর আর কোথাও এমন ইতিহাস নেই। একটি জাতি পেয়েছে একটি ভাষার মাস। একটি জাতির রক্তে রাঙা একটি ভাষার নাম। কিছু শহিদের ত্যাগের কথা আজীবন বাঙালি জাতি ও মানব জাতি স্মরণ করবে এই পৃথিবীতে। বাঙালি সেই মহান জাতি কে না তা জানে? অমর আজো আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারির গানে। ছোটবড় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের দায়িত্বাধীন সরকারপ্রধান সহ অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একগুচ্ছ ফুলের মালা মধ্যরাতে স্মৃতিসৌধে গিয়ে অর্পণ করেন সকল শহিদের স্বরণে।

এতদিন এমনটিই দেখে আসছি কিন্ত এবারের স্মৃতিসৌধে দেখা মেলেনি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির। করোনার কারণে কি এমনটি পরিবর্তন? সব কাজই তো চলছে অথচ স্মৃতিসৌধে কেন তাদের পদচারণা পড়লো না এবার? হয়তো গ্রহণযোগ্য যুক্তি রয়েছে যা আমি জানিনে তবে দেখে মনে হলো কোথায় যেন শূন্যতা বিরাজ করছে। যদিও এই দিনটির কথা আমরা শুধু বছরে একবারই মনে করি। স্বাধীনতার যুদ্ধে, ভাষা আন্দোলনের মিছিলে বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে যারা জীবন দিয়ে চলেছে তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা কতটুকু সত্যিকারার্থে? আমার মনে হয় যদি শতভাগ কৃতজ্ঞতাবোধ থাকতো তাহলে আমরা দেশেকে, দেশের সাধারণ মানুষকে সম্মানের সঙ্গে দেখতাম।

তারপর এই বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু হবে রাষ্ট্রভাষা, উপনিবেশিক শক্তি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ না মানার কারণেই বাঙালি জাতি রক্ত দিয়েছিল অথচ এখনও দেশে আর এক ঔপনিবেশিক শক্তি বৃটিশের তৈরি নিয়মকানুন আমরা মেনে চলেছি। শুধু তাই নয়, আমরা পালন করে চলেছি ইংরেজি মাস ২১ ফেব্রুয়ারি। ভাষা আন্দোলনের এত বছর পরও কেউ এ পর্যন্ত বললো না যে ২১ ফেব্রয়ারি নয়, ৮ফাল্গুন, বাংলা মাসে এ ঘটনা ঘটেছে। অনেকে তাও জানে না যে আমাদের বাংলা মাস ও বছর রয়েছে। মাসটি এবং বছরটির একটি বাংলা পরিচয় রয়েছে।

এটাই সংশধোন করা হলো না অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করেছি। নৃ-গোষ্ঠীদের ভাষা ও বর্ণমালাকে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করার জন্য ২০১৭ সাল থেকে তাদের ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রবর্তন করেছি। এবছর তাদের নিজস্ব ভাষায় প্রায় ৩৩ হাজার বই বিতরণ করেছি। আমরা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি”।

প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে বলতে চাই, দয়া করে ২১ ফেব্রুয়ারি না বলে ৮ ফাল্গুন বলা শুরু করুন অগত্যা এই দিনটিতে। শুধু কি তাই আমরা বিজয় দিবস এবং স্বাধীনতা দিবস পালনেও কিন্তু এখনও ১৬ডিসেম্বর এবং ২৬মার্চ বলি। যে ভাষার জন্য জীবন দেওয়া হলো অথচ ঠিক এই দিনটিতেও সেই বাংলা ভাষার দিন মাস ও বছরের ব্যবহার করা আজো হলো না! “জাগো বাঙালি জাগো নতুন করে ভাবো”।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন।rahman.mridha@gmail.com

আর্কাইভ থেকে

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ জন্মেছে জনগণের স্বপ্নে, কোনো পরিবারের জন্য নয়।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সংকটে দেশ: বন্ড মার্কেট বিকাশের প্রয়োজনীয়তা ও দিকনির্দেশনা
দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সমাধান- পরকালে, নাকি বিবেকের ময়দানে?
জাতিসংঘ: পতনের ছায়া নাকি পুনর্জাগরণের আলো?
পিআর পদ্ধতি কার্যকর করতে আগে দরকার প্রশাসনিক সংস্কার
হাটে জন বিক্রি আধুনিক দাসত্বের অন্ধকার ও রাষ্ট্রীয় দায়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দফা বনাম বাস্তবতা
নরওয়ের অভিজ্ঞতা বনাম বাংলাদেশের বাস্তবতা: জবাবদিহিহীন রাজনীতির অন্তরায়
তরুণ প্রজন্মের চোখে আজকের বাংলাদেশ গুজব, বিভ্রান্তি আর অনিশ্চয়তায় ভরা
কেন শিবিরের বিরুদ্ধে এত প্রপাগান্ডা?